তবে গত বছরের ২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্কে ধাক্কা খায় এ বাজার। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসই রফতানিতে দেখা দেয় ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি। যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১২ দশমিক ৮৪ শতাংশ, সেখানে চলতি অর্থবছরে প্রথমার্ধে দেশের রফতানি আয় হ্রাস পায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশে। এর মধ্যে শুধু ডিসেম্বরেই কমেছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। অবশ্য রফতানির এ নেতিবাচক ধারার একমাত্র কারণ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ নয়। এ চেয়েও বড় কারণ আমদানিকারক দেশ ও বায়াররা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।
আশার কথা হলো ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এগ্রিম্যান্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী, রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ২০ থেকে কমে ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে দেশটি থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে পোশাক তৈরি করলে তা রফতানিতে কোনো শুল্ক দিতে হবে না অর্থাৎ এক্ষেত্রে জিরো ট্যারিফ প্রযোজ্য হবে।
বিশ্বের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের তুলা উৎপাদন হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এছাড়া আমরা ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, মালি, বেনিন, বুরকিনা ফাসো ও ভারত থেকে তুলা আমদানি করে থাকি। যুক্তরাষ্ট্রের তুলার দাম কিছুটা বেশি হলেও এ থেকে উৎপাদিত পোশাক দেশটিতে রফতানির ক্ষেত্রে জিরো ট্যারিফ সুবিধা থাকায় আমরা লাভবান হতে পারব।
দেশের রফতানির ৫৪ শতাংশই নিটওয়্যার পণ্য, যা প্রাকৃতিক তুলা দ্বারা উৎপাদন করা হয়। এক্ষেত্রে মার্কিন তুলা দিয়ে তৈরি নিটওয়্যার পোশাক রফতানিতে জিরো ট্যারিফ সুবিধা পাওয়া যাবে। কাজেই এখন সময় এসেছে এ সুবিধা কাজে লাগানোর।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির অর্ধেকই হয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোয়। কিন্তু সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে ইইউর ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) আমাদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। এ চুক্তি বিশ্বের ২০০ কোটি মানুষ ও প্রায় ২৫ শতাংশ গ্রস ডমেস্টিক প্রডাক্ট (জিডিপি) কাভার করেছে। এতে ভারতের ১৪৪টি উপখাত ইইউর ২৭টি দেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। এর মধ্যে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, চামড়া, জুতা উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে বাংলাদেশ ইইউতে রফতানির ক্ষেত্রে জিএসপি, ইবিএ (এভরিথিং বাট আর্মস) সুবিধা পেয়ে আসছে, যা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। কিন্তু এরপর আমাদের জন্য জিএসপি প্লাস কার্যকর হবে। এজন্য এখনই প্রস্তুতি নেয়া দরকার।
এখানে উল্লেখ্য, ইইউর সঙ্গে এফটিএ চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। তখনই ইইউ-ভুক্ত দেশগুলোয় রফতানি বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয় দেশটি। ভারতের সরকারি ও বস্ত্র খাতের প্রতিনিধিরা ইউরোপের বিভিন্ন বায়ার যেমন ইনডিটেক্স গ্রুপের জারা, পোলিস এলপিপি, জার্মান আলদি, লিডল, ফ্রান্সের ওশান সিঅ্যান্ডএ ইত্যাদি বায়ারদের কম মূল্যে পোশাক রফতানির প্রস্তাব দেয়। ঠিক একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি বাজারের ধাক্কা সামলাতে ইইউতে কম মূল্যে পোশাক সরবরাহ শুরু করে চীন। ফলে ইইউতে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের ইউনিটপ্রতি মূল্যও কমে যায়। সম্প্রতি প্রকাশিত ইউরোপীয় ডাটা অনুসারে, ২০২৫ সালে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক পণ্যের ইউনিটপ্রতি মূল্য ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে।
রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য ও বহুমুখীকরণের কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে এখন পযন্ত উন্নয়ন ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব দেখা যাচ্ছে। আমাদের পোশাক রফতানির ৭০ শতাংশই তুলা বা তুলাজাত পণ্য। কিন্তু বিশ্ববাজারে এর বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হয়। সারা পৃথিবীতে ব্যবহৃত পোশাকের প্রায় ৭০ শতাংশই ম্যান মেইড বা কৃত্রিম তন্তুর পোশাক। তাই এখন সময় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করে মার্কিন বাজারে এ ধরনের পণ্য রফতানির মাধ্যমে জিরো ট্যারিফ সুবিধা নেয়া। এছাড়া গতানুগতিক বাজারের পাশাপাশি গালফ, জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ল্যাটিন আমেরিকান দেশগুলোয় রফতানি সম্প্রসারণ করা। এক্ষেত্রে সদ্য স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশদারত্ব চুক্তিকে (ইপিএ) পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে। এর আওতায় বাংলাদেশের প্রায় শতভাগ পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। মোট ৭ হাজার ৩৮৯টি পণ্য শূন্য শুল্কে দেশটিতে রফতানি করতে পারবে বাংলাদেশ।
পরিশেষে আমরা আশাবাদী, শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ১০০ বিলিয়ন ডলার অচিরেই অর্জিত হবে, ইনশা আল্লাহ।
মোহাম্মদ ইছা, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক
পূবালী ব্যাংক পিএলসি